ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

আল্লাহর মেহমানদের সাথে আচরণ

হজ মুসলমানের অন্যতম প্রধান ফরজ ইবাদত। তৌফিক আছে এমন ব্যক্তির জন্য জীবনে অন্তত একবার হজ করা বাধ্যতামূলক। না করে মারা গেলে কঠিন পাপের অধিকারী হতে হবে। এ জন্য প্রতি বছর সারা দুনিয়া থেকে লাখ লাখ মুসলমান হজ করতে বাইতুল্লাহ শরিফে যান। সন্দেহ নেই, একই সময় একটি স্থানে এত লোকের সমাগমে দরকারি নানা রকম আনুষ্ঠানিকতার আনজাম দেয়া অত্যন্ত কষ্টসাধ্য কাজ। কিন্তু তার পরও ইবাদত বলে কথা যারা ওখানে যাবেন এবং যারা আগন্তুকদের খেদমতের আনজাম দেবেন তারা উভয়ই সওয়াবের ভাগিদার হবেন।

আয়োজক দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থও এখানে আছে। হজে আগন্তুকরা আল্লাহর সম্মান্নিত মেহমান। কাজেই তাদের যাতে কষ্টহীন বা যথাকম কষ্টে হজব্রত পালন করিয়ে দেয়া যায় তার যথাসাধ্য চেষ্টা করা সংশ্লিষ্ট আয়োজক ও ব্যবস্থাপকদের আপ্রাণ চেষ্টা থাকা বাঞ্ছনীয়। বর্তমানে হজব্রত পালনের সাথে নি¤œল্লেখ ব্যবস্থাপক দলগুলো জড়িত :

এক. হজ্জযাত্রীর দেশের সরকার;

দুই. সে দেশেরই একশ্রেণীর এজেন্ট;

তিন. বিমান কতৃপ;

চার. টিকিট বিক্রেতা কোম্পানি এবং

পাঁচ. আয়োজক দেশের সরকার।

এদের কোনো একটি ব্যবস্থাপক দলেরই গাফিলতি, অব্যবস্থাপনা বা দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে আল্লাহর মেহমানদের যারপরনাই কষ্ট, এমনকি হজযাত্রা পর্যন্ত হতে পারে অনিশ্চিত। পরম দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, চলতি বছর বাংলাদেশ থেকে গমনেচ্ছু আল্লাহর মেহমানদের উপরিউক্ত প্রতিটি ব্যবস্থাপক দলেরই চরম অব্যবস্থাপনার কারণে অবর্ণনীয় কষ্টের শিকার হতে হয়েছে, হচ্ছে।

প্রথমত, সমস্যাটা দেখা দিয়েছে আয়োজক দেশ কর্তৃক কোটাপদ্ধতি জারির কারণে। বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মুসলমান হজে যান। সমস্যাটা হলো, এত তাড়াতাড়ি কোটা অনুসারে রেজিস্ট্রেশনকাজ বন্ধ করা হয় যে, সেই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের হজ্জযাত্রীরা সিদ্ধান্ত নিতে পরেননি, যার কারণে মেয়াল্লেম ফিও জমা সেভাবে পড়েনি। অবস্থার কারণে যা ঘটেছে দেশের নৈতিক মান স্খলিত হজ এজেন্সিগুলো বিরাট একটা সংখ্যার ভুয়া নাম তালিকাভুক্ত করে আবেদন করে। এর ফলে সৌদি সরকার কর্তৃক কোটার চেয়ে আবেদন হয় বেশি। এতে করে রেজিস্ট্রেশনে বাদ পড়ে যায় আসল মেয়াল্লেম ফি জমাদানকারী বিরাট একটি সংখ্যা। রেজিস্ট্রেশন হয় ভুয়া নামধারীদের। অধঃপতিত সমাজব্যবস্থার অধঃপতিত হজ কর্মকর্তা আর ইতোমধ্যে মনুষ্য চরিত্রবর্জিত এজেন্সি মালিকদের মধ্যে বোঝাপড়ার মাধ্যমে হিড়িক পড়ে কথিত রিপ্লেসমেন্ট বাণিজ্যের।

মোয়াল্লেম ফি জমাদানকারী অথচ রেজিস্ট্রেশন বঞ্চিতদের কাছ থেকে এসব নরপশু আরো বাড়তি টাকা আদায় করে কথিত বিশেষ ব্যবস্থায় তাদের অনেকের যাত্রা নিশ্চিত করে। এক দিকে সৌদি সরকারের অতি অল্প সময় বেঁধে দেয়া, অন্য দিকে এজেন্সি মালিক, সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে অবৈধ দরকষাকষি বাণিজ্যে সৃষ্ট দীর্ঘসূত্রতার কারণে ইতোমধ্যে যারা নিশ্চিত হয়েছে তাদের পাসপোর্টে ভিসা লাগানো নিয়েও দেখা দিয়েছে জটিলতা। এ দিকে নিয়মমাফিক হজ ফাইট গেছে শুরু হয়ে। আবার ভিসা জটিলতায় পড়ে দেখা দিয়েছে টিকিট জটিলতা। বিশেষ করে সরকারি যাত্রীদের ফাইটের তারিখ আসা অনেকেরই ভিসা হয়নি। কারো ভিসা হয়েছে তো টিকিট হয়নি। ফলে দেখা গেছে, যাত্রীর জন্য নির্ধারিত ফাইটের সিট খালি যাচ্ছে।

বিমান কর্তৃপ এ অবস্থায় পরের ফাইটের যাত্রীদের ডেকে নিয়ে তাদের শিডিউল বিপর্যয় ঠেকানোর কসরত চালাচ্ছে। এ দিকে ভিসাপ্রাপ্ত যাত্রীদের ফাইট ধরতে তাড়াহুড়ো করে টিকিট পেতে গিয়ে আরেক নীতিহীন টিকিট কোম্পানি বা কর্তৃপকে অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় এক জঘন্যতম হ-য-ব-র-ল অবস্থা। স্বীকার করতেই হবে, এ বছর বাংলাদেশ থেকে গমনেচ্ছু আল্লাহর মেহমানদের যে কষ্ট হচ্ছে তার দায়দায়িত্ব দুই দেশের সরকার কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।

প্রথমত, হজে কোটারি করা আল্লাহর মেহমানদের হজ করতে বাধা দেয়ার শামিল। দুনিয়ার বিভিন্ন মুসলিম দেশ থেকে এ ব্যাপারে সৌদি সরকারের সাথে কথা বলা উচিত। হজযাত্রীদের বাধা দিয়ে নয়, আধুনিক যুগে আধুনিক সব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আল্লাহর মেহমানদের স্বাচ্ছন্দ্যময় হজের ব্যবস্থা করতে হবে। কোটা জটিলতার কারণে যারা এ বছর বাদ পড়লেন যেকোনো কারণে তারা যদি জীবনে আর হজ করতে না পারেন, তবে তাদের ফরজিয়াত তরকের জন্য দায়ী হবে কারা? সৌদি সরকারকে বিশ্বাস রাখতে হবে, এটা তাদের দয়া নয়, এখানে তাদের স্বার্থও জড়িত আছে। আর ওখানে যাওয়া মুসলমানদের আল্লাহ-প্রদত্ত অধিকার। কাজেই তারা সুন্দরভাবে ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হলে বিশ্বমুসলিমদের নিয়ে হজ ব্যবস্থাপনা কমিটি করে তাদের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া হোক।

সৌদি দূতাবাস, বিশেষ করে বাংলাদেশী হজযাত্রীদের ভিসা প্রসেসিংয়েও যারপরনাই চরম গাফিলতি বা অব্যবস্থাপনার পরিচয় দিয়েছে, দিচ্ছে। একজনের ভিসা অন্যজনের পাসপোর্টে লাগিয়েছে। একই পরিবারের দুইজনের ভিসা ভিন্ন সময়ে লাগিয়েছে, যার কারণে অন্যজনের ফাইট বাতিল করে চরম উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় কালাতিপাত করতে হয়েছে, হচ্ছে। বাংলাদেশে সরকারি হজ কর্মকর্তরা লজ্জা, শরম, হায়া আর বিবেকের মাথা খেয়ে অনিয়মকে প্রশ্রয় দিয়ে দু’হাতে টুপাইস কামাইয়ের ধান্ধায় দিবানিশি ব্যস্ত রয়েছেন, আছেন। তাদের সাথে যোগসাজশে দুষ্কর্ম করতে পারবে, এমন আশায়ই অধঃপতিত এজেন্সি মালিকেরা ওই রকমভাবে ভুয়া নাম এন্ট্রি করিয়েছে। আগেই বলেছি, এ ভুয়া নামের কারণে আসল মোয়াল্লিম ফি জমাদানকারী দুর্ভাগা হজযাত্রীরা কোটারি জটিলতায় রেজিস্ট্রেশন থেকে বাদ পড়তে বাধ্য হয়েছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এসব তাদের ইচ্ছাকৃত সৃষ্টি। নইলে ভুয়া নাম শনাক্ত হওয়ার পরেও কেন সেগুলো বাদ দিয়ে মোয়াল্লিম ফি জমাদানকারী বাদ পড়াদের নাম ঢুকিয়ে তাদের যাত্রা নিশ্চিত করতে টালবাহানা হচ্ছে? রহস্যটা কোথায়?

শোনা যাচ্ছে, কথিত রিপ্লেসমেন্টের আবেদন দিয়ে এজেন্ট-মালিকের প্রতিনিধিরা এখনো দিবানিশি নির্ঘুম তীর্থের কাকের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন হজ অফিসের দরজায়। আর এখানে চলছে টাকাকড়ির খেলা। হায়রে মুসলমান! ফরজ ইবাদত হজ। মুসলমানের জন্য শিাÑ সব রকমের ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত হালাল উপার্জনের ব্যবহার। ঘুষ বা যেকোনো অবৈধ লেনদেন ইসলামে হারাম। হজ একটি ফরজ ইবাদত। সেই হজ পালনের রাস্তাটা যদি হয় এমনই হারাম লেনাদেনায় তৈরি, তবে সেখানে কি মকবুল হজ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে?

সুষ্ঠু হজ ব্যবস্থাপনার জন্য কয়েকটি প্রস্তাব

এক. কোটাপদ্ধতি বাদ দিতে হবে। যদি একান্ত রাখতেই হয় তবে তা স্থায়ী করে দিতে হবে, যাতে সে দেশের সরকারসহ এজেন্সি মালিকদের তা আগে থেকেই জানা থাকে।

দুই. রিপ্লেসমেন্ট নিয়ম কখনো কখনো জরুরি। কাজেই বাদ দেয়ার উপায় নেই। তবে কেবল যথাযথ তদন্ত ছাড়া এ সুযোগ দেয়া যাবে না। মাত্র মৃত ব্যক্তির বা হজ পালনে আসলেই অম ও অসুস্থ হয়ে যাওয়ার জন্য এ নিয়ম রাখতে হবে।

তিন. হজের সার্বিক ব্যস্থাপনায় আল্লাহভীরু, ধার্মিক হজের গুরুত্ব বোঝেন এমন পরহেজগার কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিতে হবে।

চার. দুর্নীতিগ্রস্ত হজ এজেন্সি এবং তাদের দোসর অসাধু কর্মকর্তাদের কঠিন শাস্তি দিতে হবে।

পাঁচ. শাবান মাসের মধ্যে সব অফিসিয়াল কার্যক্রম শেষ করতে হবে। রমজান মাসের মধ্যে ভিসা লাগানোর কাজ সমাপ্ত করতে হবে।

সর্বোপরি কথা, নতুন পদ্ধতি বলে সমস্যা একটু হয়েছে। চলতে থাকলে অভ্যস্ত হয়ে যাবে সবাই। শোনা যায়, সামনে থেকে লটারি পদ্ধতিতে হজযাত্রী নেয়া হবে। এটা নৈতিকভাবে অধঃপতিত এসব দেশে সমস্যা আরো জটিল করবে। লটারিতে যারা বাদ যাবেন তাদের হৃদয়ের রক্তরণ কে ঠেকাবে? পরের বছর পর্যন্ত যে তারা বেঁচে থাকবেন তারই গ্যারান্টি কে দেবে? তা ছাড়া কথিত লটারিতে পরের বছরও যে তারা বাদ যাবেন না, এমন নিশ্চয়তাও বা কে দেবে? কাজেই আল্লাহর মেহমানদের নিয়ে আবার কোনো নতুন পদ্ধতির পরীা করতে গিয়ে তাদের আরেকবার গিনিপিগে পরিণত না করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

Category: হজ্জ