ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

হজের মাসলা-মাসায়েল

হজ হচ্ছে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি আর্থিক ও শারীরিক ইবাদতও বটে। হজের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ইচ্ছা করা, সঙ্কল্প করা। শরিয়তের পরিভাষায় হজের মাসগুলোতে বিশেষ কিছু কার্য সম্পাদনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু স্থানের জিয়ারত করাকে হজ বলে।

হজের মাসগুলো : শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজের দশ দিন। বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে হজ যখন ওয়াজিব হয় তখনই পালন করা এবং একবারই পালন করা ফরজ।

হজ ফরজ হওয়ার শর্ত আটটি :

(১) মুসলমান হওয়া,

(২) জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া,

(৩) বালেগ হওয়া,

(৪) স্বাধীন হওয়া,

(৫) হজের সময় হওয়া,

(৬) মধ্যম ধরনের ব্যয় হিসেবে সফরের ব্যয় বহনের সামর্থ্য থাকা, যদি হজ পালনকারী মক্কা শরিফে অবস্থান করে তবুও

(৭) যারা মক্কা শরিফের বাইরে থাকেন তাদের জন্য হজ পালনের শর্ত হলো মালিকানা বা ভাড়া সূত্রে স্বতন্ত্রভাবে একটি বাহন বা অন্য কিছু ব্যবহারের সামর্থ্য থাকা যেমন : আমাদের দেশের হাজীরা বিমান ব্যবহার করে থাকেন। তবে কেউ যদি বিনিময় ছাড়া তার বাহন বা সওয়ারি ব্যবহারের অনুমতি দেয় তাহলে তা সামর্থ্য হিসেবে গণ্য হবে। যারা মক্কার আশপাশে অবস্থান করেন, তাদের ওপর তখন হজ ফরজ হয়। যখন তারা কষ্ট সহ্য করে নিজ শক্তিতে হেঁটে হজ করতে পারে। কিন্তু হাঁটতে সক্ষম না হলে সেই ব্যক্তি মক্কার অধিবাসী হোক বা না হোক তার জন্য অবশ্যই বাহনের প্রয়োজন হবে।

(৮) অমুসলিম দেশে ইসলাম গ্রহণকারী ব্যক্তির ‘হজ ইসলামের একটি রুকন (ফরজ)’ এ কথা জানা থাকা বা সে ব্যক্তি মুসলিম দেশের অধিবাসী।

হজ ওয়াজিব হওয়ার শর্ত পাঁচটি :

(১) সুস্থ থাকা,

(২) হজে যাওয়ার বাহ্যিক বাধা দূরীভূত হওয়া,

(৩) রাস্তাঘাট নিরাপদ থাকা (স্থল ও সামুদ্রিক পথে যদি বেশির ভাগ লোক নিরাপদে ফিরে আসে তবেই রাস্তা নিরাপদ বলে ধর্তব্য হবে।)

(৪) মহিলারা তাদের ইদ্দত অবস্থায় না থাকা,

(৫) নারীর বেলায় হজে তার সাথে একজন মুসলমান আস্থাভাজন, জ্ঞানসম্পন্ন, বালেগ মাহরাম পুরুষ বা স্বামী থাকা। মাহরাম ব্যক্তি স্তন্য সূত্রে মাহরাম হতে পারে অথবা বৈবাহিক সূত্রেও হতে পারে।

চারটি কাজে হজ পালন : চারটি কাজ করলে স্বাধীন ব্যক্তির হজের ফরজ বিশুদ্ধভাবে পালিত হয়।

এক. ইহরাম।

দুই. ইসলাম। এ দু’টি হলো হজের শর্ত অতঃপর হজের অন্য দুই ফরজ পালন করা। অর্থাৎ জিলহজের নবম তারিখে সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে যাওয়ার পর থেকে কোরবানির দিনের ফজর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অন্তত এক মুহূর্ত আরাফাতের ময়দানে ইহরাম অবস্থায় থাকা। তবে শর্ত হলো এর আগে ইহরাম অবস্থায় স্ত্রী সহবাস না করা চাই। দ্বিতীয় ফরজ হলো তাওয়াফে জিয়ারতের বেশির ভাগ চক্কর যথাসময়ে অর্থাৎ দশম তারিখের ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর পালন করা।

হজের ওয়াজিবসমূহ :

(১) মিকাত থেকে ইহরাম বাধা,

(২) সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা,

(৩) জিলহজের দশ তারিখে ফজরের সময় শুরু হওয়ার পর এবং সূর্যোদয়ের আগে মুজদালিফায় থাকা,

(৪) পাথর নিক্ষেপ করা,

(৫) হজে কেরান ও হজে তামাত্তু পালনকারীর পশু জবেহ করা,

(৬) মাথা মুণ্ডানো বা চুল ছোট করা,

(৭) মাথা মুণ্ডানোর কাজটি হারাম শরিফে এবং কোরবানির দিনগুলোতে সম্পন্ন করা,

(৮) মাথা মুণ্ডানোর আগে পাথর নিক্ষেপ করা,

(৯) হজে কেরান ও হজে তামাত্তু পালনকারীর পাথর নিক্ষেপ ও মাথা মুণ্ডানোর মধ্যবর্তী সময়ে পশু জবাই করা,

(১০) কোরবানির দিনগুলোতে তাওয়াফে জিয়ারত সম্পন্ন করা,

(১১) হজের মাসগুলোতে সাফা-মারওয়ার মধ্যখানে সায়ি করা,

(১২) গ্রহণযোগ্য তাওয়াফের পর সায়ি করা,

(১৩) ওজর ব্যতীত হেঁটে সায়ি করা,

(১৪) সাফা থেকে সায়ি আরম্ভ করা,

(১৫) বিদায়ী তাওয়াফ করা,

(১৬) বায়তুল্লাহ শরিফের সব ক’টি তাওয়াফ হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর) থেকে শুরু করা,

(১৭) ডান দিক থেকে তাওয়াফ শুরু করা,

(১৮) ওজর ছাড়া হেঁটে তাওয়াফ করা,

(১৯) ছোট-বড় উভয় ধরনের হাদাস থেকে পবিত্র থাকা,

(২০) সতর ঢাকা,

(২১) তাওয়াফে জিয়ারতের বেশির ভাগ চক্কর (কোরবানির দিনগুলোতে) সম্পন্ন করার পর অবশিষ্ট চক্করগুলো সম্পন্ন করা ও

(২২) নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকা যেমন : পুরুষরা সেলাইকৃত কাপড় পরিধান করা এবং মাথা ও চেহারা ঢাকা, মহিলারা চেহারা ঢাকা, যৌন উত্তেজক কথাবার্তা বলা, গুনাহের কাজ করা, ঝগড়া-বিবাদ করা, শিকার বা শিকারের প্রতি ইশারা করা কাউকে শিকার দেখিয়ে দেয়া প্রভৃতি।

হজের কার্যাবলি পুরোপুরিভাবে সম্পাদনের পদ্ধতি : যখন কেউ হজ করার ইচ্ছা করবে তখন সে মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধবে। ইহরাম বাঁধার নিয়ম এই যে, ইহরাম বাঁধার আগে গোসল কিংবা ওজু করে নেয়া। তবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য গোসলই উত্তম। কাজেই হায়েজ ও নেফাসগ্রস্ত নারীর যদি গোসল করলে ক্ষতি না হয় তাহলে গোসল করবে। নখ ও গোঁফ কেটে, বগলের পশম পরিষ্কার করে, নাভির নিচের পশম মুড়িয়ে, গোসল করে সুগন্ধি লাগিয়ে তেল ব্যবহার করে সম্পূর্ণরূপে পরিষ্কার হওয়া মুস্তাহাব। পুরুষ লোক একটি ইজার ও চাদর পরিধান করবে, যা নতুন কিংবা ধোয়া হতে পারে। তবে নতুন সাদা কাপড় উত্তম। চাদরটি বোতামবিহীন হতে হবে। কোনো ধরনের জোড়া বা কাপড় ছিঁড়ে গলায় ঝুলিয়ে রাখা সম্পূর্ণ নিষেধ। এ ধরনের কাজ করা মাকরুহ। এ জন্য তার ওপর ক্ষতিপূরণ হিসেবে কোনো কিছু ওয়াজিব হবে না।
এবার দুই রাকাত নামাজ পড়–ন।

অতঃপর বলুন, হে আল্লাহ আমি হজ পালন করার ইচ্ছা করেছি, সুতরাং আপনি আমার জন্য কাজটি সহজ করে দিন এবং আমার পক্ষ থেকে তা কবুল করুন। নামাজের পর তালবিয়া পড়–ন ‘লাব্বায়িক আল্লাহুম্মা লাব্বায়িক, লাব্বায়িক লা শারিকালাকা লাব্বায়িক, ইন্নাল হামদাহ, ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাকা’। যখন আপনি হজ বা ওমরার নিয়তে তালবিয়া পড়লেন তখনই আপনার ইহরাম বাঁধা হয়ে গেল। সুতরাং এ সময় থেকে আপনি রাফাস তথা স্ত্রীসম্ভোগ থেকে বিরত থাকবেন। সব সময় তালবিয়া পড়–ন, তবে চিৎকার দেয়ার প্রয়োজন নেই। যার দ্বারা নিজের বা অন্যের ক্ষতি হয়। যখন আপনি মক্কায় পৌঁছবেন তখন আপনার গোসল ও দরজায়ে মুআল্লা দিয়ে প্রবেশ করা মুস্তাহাব।

হজের প্রকারভেদ : হজ মোট তিন প্রকার। ১. হজে ইফরাদ, ২. হজে তামাত্তু ও ৩.হজে কেরান।

হজে ইফরাদের পরিচয় : ইফরাদ শব্দের আভিধানিক অর্থ : একা, একাকি বা পৃথক। শরিয়তের পরিভাষায় মিকাত থেকে শুধু হজের নিয়ত করে ইহরাম বেঁধে শুধু হজ সম্পন্ন করার নাম ইফরাদ।

হজে তামাত্তুর পরিচয় : তামাত্তুর আভিধানিক অর্থ : উপকারিতা অর্জন করা, উপভোগ করা। পরিভাষায় মিকাত থেকে প্রথমে ওমরার ইহরাম বেঁধে তার কার্যাবলি সমাপন করে হালাল হওয়ার পর হজের সময় হজের ইহরাম বেঁধে তার আহকামগুলো সম্পাদন করাকে তামাত্তু বলে।

হজে কেরানের পরিচয় : কেরানের শাব্দিক অর্থ : মেলানো, মিশ্রণ করা। পরিভাষায় মিকাত থেকে একসাথে হজ ও ওমরার নিয়ত করে ইহরাম বেঁধে উভয়টিকে একই ইহরামে সমাপ্ত করাকে কেরান বলে।
কেরান হজের প্রথম কাজ : কেরানের মধ্যে সর্বপ্রথম ওমরার কাজ সম্পন্ন করে দিতে হবে, তার পর হজের কাজ শুরু করতে হবে। এ কারণে কোনো ব্যক্তি প্রথমে হজের নিয়তে তাওয়াফ করলেও ওমরাহর তাওয়াফই হবে।

কেরানকারীর কোরবানির বিধান : কেরানকারীরা কোরবানির দিবসে হজ ও ওমরাহ উভয়ের জন্য কোরবানি করবে। কেননা আল্লাহ তায়ালা তাকে একই সময়ে একই ইহরামে হজ ও ওমরাহ দু’টিই আদায় করার সুযোগ দিয়েছেন। আই আল্লাহর শুকরিয়া হিসেবে তার ওপর একটি কোরবানি ওয়াজিব হবে। আর যদি কোরবানির সামর্থ্য না থাকে তাহলে ১০টি রোজা রাখতে হবে। এগুলোর মধ্যে তিনটি হজের দিনগুলো তথা ৭, ৮ ও ৯ তারিখে রাখতে হবে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে আদায় করতে সে তার সাধ্যানুযায়ী কোরবানি দেবে। আর যে ব্যক্তি কোরবানি দিতে অক্ষম হবে সে হজের সময় তিন দিন রোজা রাখবে আর যখন তোমরা হজ হতে প্রত্যাবর্তন করবে তখন আরো সাতটি রোজা রাখবে।

কেরান নিয়তকারী ওমরা ছেড়ে দিলে তার হুকুম : কেরান পালনকারী যদি মক্কায় প্রবেশ না করে সোজা আরাফায় চলে যায় তবে তার ওমরা বাতিল ও মুফরিদ হিসেবে গণ্য হবে। এ ওমরা ছেড়ে দেয়ার কারণে তার ওপর একটি দম ও আবার কাজা ওয়াজিব হবে। কেননা সে নিয়তের মাধ্যমে তার ওপর ওয়াজিব করে নিয়েছিল। আর ওয়াজিব পরিত্যাগের জন্য কাজা ওয়াজিব হয়েছে। আর যদি মক্কায় দাখিল হয়ে ওমরার বেশির ভাগ কাজ করার আগেই আরাফায় চলে আসে তাহলেও উপরি উক্ত হুকুম প্রযোজ্য হবে, তবে ওমরাহর তাওয়াফের বেশির ভাগ যেমন : সাত চক্করের স্থলে চার চক্করের পর আরাফায় চলে গেলে তার ওমরাহ বাতিল হবে না। বরং কোরবানির দিবসে তা পূরণ করে দেবে।

হজে তামাত্তুর পরিচয় : তামাত্তুর আভিধানিক অর্থ উপকৃত হওয়া বা লাভবান হওয়া। শরিয়তের দৃষ্টিতে তামাত্তু বলা হয় হজের মাসগুলোতে তথা শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ মাসে মিকাত থেকে শুধু ওমরাহর ইহরাম বেঁধে ওমরাহর কার্যাবলি সম্পাদন করে হালাল হয়ে যাওয়া। এর পর জিলহজ মাসের ৮ তারিখে আবার ইহরাম বেঁধে হজ সমাপন করা।

তামাত্তুকারী তাওয়াফের সাথে সাথে তালবিয়া পাঠ বন্ধ করে দেবে : তামাত্তু আদায়কারী হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের পর ওমরাহর তাওয়াফ শুরু করার সাথে সাথে তালবিয়া পাঠ বন্ধ করে দেবে। মহানবী সা: থেকে অনুরূপ বর্ণিত আছে। ইমাম রহ: বলেন : ‘বাইতুল্লাহ শরিফের প্রতি দৃষ্টি পড়ার সাথে সাথে তালবিয়া পাঠ বন্ধ করে দেবে’।

দমের হুকুম : তামাত্তু আদায়কারীর ওপর শুকরিয়াস্বরূপ কিরান আদায়কারীর মতো একটি কোরবানি করা ওয়াজিব। যদি সে কোরবানি করতে অক্ষম হয় তাহলে কোরবানির দিনের আগে তিনটি এবং বাকি সাতটি রোজা পরে রাখতে হবে।

আইয়্যামে হজের বিভিন্ন নাম : ১. জিলহজের ৮ তারিখকে ‘ইয়াউমুত তারউইয়্যাহ’। ২. ৯ তারিখকে ‘ইয়াউমুল আরাফাহ’। ৩. ১০ তারিখকে ‘ইয়াউমুন নাহ্র’। ৪. ১১ তারিখকে ‘ইয়াউমুল ওকুফ’। ৫. ১২ তারিখকে ‘ইয়াউমুল নাফরিল আওয়াল’ এবং ৬. ১৩ তারিখকে ‘ইয়াউমুল নাফরিস সানি’ বলে।

হজে তামাত্তু বাতিল হওয়ার কারণ : তামাত্তুকারী হাদি প্রেরণ না করে হজের মাসে ওমরাহর কাজ সমাপন করে নিজ দেশে ফিরে গেলে তার তামাত্তু বাতিল হবে। আর যদি হাদির জানোয়ার প্রেরণ করে তা হলে ইমাম আবু হানিফা ও আবু ইউসুফ রহ:-এর মতে তার তামাত্তু বাতিল বলে গণ্য হবে।

হজের মাসের আগে ওমরাহর কাজ আংশিক করলে হজে তামাত্তু হবে কি না : কোনো ব্যক্তি যদি হজের মাসের আগে ওমরা করে চার চক্করের কম তাওয়াফ করে এরপর বাকি তাওয়াফ হজের মাসে করে তা হলে তার তামাত্তু হবে না। বরং সে তামাত্তুকারী হিসেবে পরিগণিত হবে।

Category: হজ্জ