ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

হজ : এক জীবনের ভ্রমণ

‘হাজির, হে প্রভু আমি হাজির, আপনার কোনো শরিক নেই। আমি হাজির, সব প্রশংসা আপনার,
সব ক্ষমতা আপনারই, আপনার কোনো অংশীদার নেই।’


তালবিয়ার এই লাব্বায়েক ধ্বনি যখন মসজিদে হারাম, মিনা, আরাফাহ, মুজদালিফার প্রান্তরজুড়ে প্রতিধ্বনিত হয় তখন বান্দার সাথে সম্পর্কটা যেন মহান প্রভুর সাথেই একান্ত হয়ে যায়। এই পবিত্র ভ্রমণে ইহরাম যেন মৃত্যু সময়ের প্রস্তুতি। তাওয়াব হলো আল্লাহর সাথে একাত্ম হওয়া। সাই হলো প্রচেষ্টা, অনুসন্ধান এবং যন্ত্রণার অনুভব। জমজম হলো জীবন আর পরিপূর্ণতা। আরাফাহ স্মরণ করিয়ে দেয় কেয়ামতের দিন। মুজদালিফায় নতুন ভোরের আগে অন্ধকারের প্রতিচ্ছবি। মিনা, কোরবানি এবং ইহরাম ছেড়ে নতুন এক জীবন। জামারায় পাথর নিক্ষেপ শয়তানের বিরুদ্ধে আজীবনের সংগ্রাম। তবে, জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হলো মহান প্রভু আল্লাহ। সেই পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে সারা বিশ্বের ২০-৩০ লাখ মানুষ প্রতি বছর লাব্বায়েক বলে হাজির হয়। এ হাজিরা যেন শুধু মহাপ্রভুর ক্ষমা ও করুণা বর্ষণের আর বান্দাদের তাঁর কাছে আকুতি ও প্রার্থনা জানানোর।

২০১৫ সালের হজ একেবারেই সমাগত। আগের বছরের হজের মহাসম্মেলন ছিল বেশ খানিকটা ব্যতিক্রমী। হারাম শরিফের সংস্কার ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিশাল আয়োজনের জন্য হজযাত্রীদের সংখ্যা বেশ সীমিত করে আনা হয়। নতুন ব্যবস্থাপনায় যেখানে ৬০ লাখ মানুষের হজ পালনের সুবিধা তৈরি করা হয়েছে সেখানে ২০১৪ সালে হজযাত্রীর সংখ্যা ছিল এর এক-তৃতীয়াংশ। আল্লাহর দরবারে সামর্থ্যবান মুসলমানদের হাজিরা দেয়ার এক জীবনের এই অপরিহার্য ভ্রমণ আবেগ আর সংবেদনশীলতার সমন্বয়। এটিই একমাত্র সফর যেখানে ভ্রমণকারী হন পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার মেহমান। আল্লাহর কাছেই হাজিরা দিতে বান্দা উপস্থিত হন সেখানে। এই হজের সফর এমন এক ক্ষমা করুণা ও রহমতের আবহের মধ্য দিয়ে পার হয় যেটিকে অনুভব করতে পারেন প্রতিজন পবিত্র গন্তব্যের অভিযাত্রী। এই অনুভবের বর্ণনা আসে একেকজনের কলমে একেকভাবে।

২০১৪ সালে সস্ত্রীক হজ পালনের এই অপূর্ব অনুভূতির সাথে হজের আনুষ্ঠানিকতার নানা তাৎপর্য আর ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে একাত্মভাবে পাওয়া যায় বিশিষ্ট গবেষক ও সত্য অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তিত্ব শাহ আব্দুল হালিমের লেখা ‘হজ : জার্নিঅব এ লাইফ টাইম’-এ। তিনি এমন একজন ব্যক্তি যার পূর্বপুরুষেরা ইসলামের প্রোজ্বল আলো ছড়িয়ে দিতে এ ভূখণ্ডে এসেছিলেন। কর্মসূত্রে জনাব হালিমের বিশেষ উদ্যোগে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি খাদেমুল হারামাইনের দাওয়াতে রাজকীয় অতিথি হিসেবে হজ পালনের সুযোগ লাভ করেছেন। আর তিনি মহান প্রভুর কাছে হাজিরা দেয়ার সুযোগ লাভ করলেন অবসর জীবনের মধ্য সময়ে এসে।

বইটির শুরুতে তিনি এক স্বপ্নের কথা বলেছেন যার সাথে এর সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে। তিনি বলেছেন, ‘সারা জীবনের আকাক্সক্ষা ছিল আমি মক্কায় আল্লাহর ঘর কাবা দেখব। বারবার স্বপ্ন দেখেছি আমি কাবায় গিয়েছি, দেখে আমি আপ্লুত হয়ে কাবা বা গিলাপ স্পর্শ করার চেষ্টা করছি কিন্তু প্রতিবারই জেগে উঠি সেই পরম মুহূর্তটির আগেই। আমার আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থেকে যায়। নিজেকে মনে হয় অসহায়। ভাবি কেন আমি কাবা স্পর্শ করতে পারছি না। হয়তো আমার এমন কোনো অপূর্ণতা আছে যার কারণে বোধহয় কাবা স্পর্শ করতে পারব না আমি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে সুযোগ আল্লাহর মেহেরবাণিতে এসে যায়।’ আমরা যারা তিন-চার দশক বা তার চেয়ে বেশি সময় ধরে পরিচিত তাদের অনেকেই জানতাম না শাহ আবদুল হালিম হজ বা উমরা করতে কখনো সৌদি আরব যাননি।

যে জীবনবোধ, আদর্শ ও একনিষ্ঠতাকে পারিবারিকভাবে শাহ আবদুল হালিম লালন করেন তার ছাপ ৬৪ পৃষ্ঠার ইংরেজিতে লেখা এ বইয়ে পাঠ করা যায়। পবিত্র কাবা ঘর, গিলাপ, জমজম, মাকামে ইব্রাহিম, হজরে আসওয়াত, সাফা মারওয়ার যে বর্ণনা তিনি তুলে ধরেছেন তার মধ্যে এমন অনেক তথ্য ও অনুভবের কথা রয়েছে যা সাধারণের লেখায় আসে না। কাবার চতুপার্শ্বের যে অলৌকিক স্থাপনা তার ভেতরের অনেক রহস্য অনেকের অজানা। কাবাকে আবৃত করে রাখা সোনালি অক্ষরের পবিত্র ঐশিবাণীসমৃদ্ধ কালো মখমলের গিলাফ বছরে একবার পরিবর্তন করা হয়, জিলকদ মাসের ৯ তারিখ। এই গিলাফ পরিবর্তনের সময় ঐতিহ্য অনুসারে সৌদি সরকার সব মুসলিম দেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানান। এ সময় অনেক দেশের শীর্ষ ব্যক্তিরা এই পবিত্র অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

আবার অনেক দেশের রাষ্ট্রদূত স্ব-স্ব সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। নতুন গিলাফে কাবা আবৃত করার পর পুরনো গিলাফটির ছিন্ন টুকরো আমন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় অতিথিদের উপহার হিসেবে দেয়া হয়। ২০০৪ সালে মক্কায় অনুষ্ঠিত ওআইসির বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে একবার পবিত্র দৃশ্যটি অবলোকন করার সুযোগ হয়েছিল। তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নিজে ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তখন ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার এক বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল মক্কায়। তখনকার সংসদ সদস্য মোসাদ্দেক আলী ফালু গিলাফ পরিবর্তনের সময় সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠেছিলেন। আমরা তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কালো গিলাফে আবৃত কাবার অভ্যন্তরে কী রয়েছে। যতদূর মনে পড়ে তিনি বলেছিলেন শূন্যতা। কাবার ভেতরের রহস্য নিয়েই শাহ আবদুল হালিম তার বইয়ে এক প্রশ্নের সুরাহা করেছেন। মার্টিন লিংস তার ‘মোহাম্মদ : হিজ লাইফ বেইজড অন আর্লি সোর্স’ শীর্ষক বইয়ে বলেছেন, মক্কা বিজয়ের পর মোহাম্মদ সা: সব মূর্তি বিচূর্ণ করে ফেলেছিলেন কিন্তু তিনি কাবার ভেতরে থাকা হজরত ইব্রাহিম আ:, হজরত মরিয়ম আ: ও হজরত ঈসা আ:-এর প্রতিকৃতিকে অক্ষত রেখেছিলেন। আল্লাহর রাসূল সা: যদি আসলেই এটি করে থাকেন তাহলে তা পরে কেউ পরিবর্তন করার কথা নয়। কিন্তু এটি যে ভিত্তিহীন কোনো গল্প সেটি জনাব হালিম এই অনুষ্ঠানের এক প্রত্যক্ষদর্শী বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূতের বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছেন।

শাহ আবদুল হালিম পবিত্র কাবার ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে কুরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলোকে তুলে এনেছেন। মুহাম্মদ আসাদের বিখ্যাত বই দি রোড টু মক্কা, মোহাম্মদ হোসেইন হাইকলের বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ ‘দি লাইফ অব মোহাম্মদ’ থেকে মূল্যবান উদ্ধৃতি তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, হজরত ইসমাঈল আ:-এর পর কাবার প্রথম সংস্কার করেন হিজরির ২২৫ বছর আগে হিমায়ারের বাদশাহ তুব্বা আবু কার্ব আসাদ। তিনি প্রথম কাবাকে গিলাফ দিয়ে আবৃত করেন এবং কাবার একটি দরজা নির্মাণ করে তাতে তালা চাবির ব্যবস্থা করেন। আবরাহা যখন পবিত্র কাবা ধ্বংস করতে মক্কা এসে আবাবিল পাখির পাথরে নিজের বাহিনীসহ ধ্বংস হয়, তখন এ চাবি উত্তরাধিকার পরম্পরায় ছিল রাসূল সা:-এর দাদা আবদুল মোত্তালিবের কাছে। এখনো হাজিরা মিনায় আবারাহার সেই ধ্বংস স্থলটি দ্রুত পার হয়ে যান।

শাহ আবদুল হালিমের বইটিতে একজন হজযাত্রীকে কিভাবে ইসলামের এই ইবাদতটি সম্পন্ন করতে হয় তার বর্ণনা রয়েছে। সেই সাথে এসব আনুষ্ঠানিকতার অন্তর্নিহিত কী তাৎপর্য রয়েছে, সেটিও তিনি তুলে ধরেছেন। বইটির শুরুতে হজের প্রতিটি আহকামের যে তাৎপর্যের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা পরে দিয়েছেন। একই সাথে একজন হজে না গিয়েও যাতে এর আনুষ্ঠানিকতা ও আধ্যাত্মিকতা উপলব্ধি করতে পারেন তার জন্য প্রতিটি স্থান ও কার্যক্রমের বর্ণনাও দিয়েছেন। হজের মূল দিবস আরাফাতের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেছেন, আরাফাহর দিনটি আর কিছু নয় এটি হলো প্রভু আল্লাহর সাথে কথা বলা। লাখ লাখ হজ পালনকারী মহাপ্রভুর কাছে আকুতি জানায়, ক্ষমা প্রার্থনা করে, ভিক্ষা করে করুণা ও দয়া। মহান আল্লাহ এদিন সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত বান্দার মুনাজাত কবুল করার জন্য উদগ্রীব থাকেন। হজরত আদম আ: ও হজরত হাওয়া আ:-এর দোয়া কবুল ও পুনর্মিলনের এ প্রান্তরটি হলো গোনাহ মাফের ও দোয়া কবুলের জায়গা। প্রান্তরটি এখন আর বৃক্ষহীন মরুভূমি নেই। বাংলাদেশেরই এক প্রেসিডেন্ট জিয়া আরাফাতের পুরো প্রান্তর চেকে দিয়েছেন সবুজ নিম গাছে।

বইটির লেখক হজের এই বিশ্ব মুসলিম সমাবেশে অবলোকন করেছেন উম্মাহর অখণ্ড চেতনা ও ভ্রাতৃত্ববোধকে। এ জন্য আরাফাহ মুজদালিফাহ এবং মিনার হজযাত্রীদের বিচ্ছিন্ন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অবস্থানকে একটি অভিন্ন সম্মেলনের মতো আবহে নিয়ে আসা যায় কি না তার সুপারিশ করেছেন। যাতে এসব প্রান্তর মানব সমুদ্রের মতো দেখা যায়। আরাফাহর হজের খুতবা অনুবাদসহ উপস্থিত হাজিদের দেয়া ও বিশ্বময় প্রচারের ব্যবস্থার সুপারিশও করেছেন তিনি। বিশ্ব মুসলিমের ভ্রাতৃত্ব ও একাত্ম হওয়ার প্রয়াস এতে আরো জোরালো হবে। এ ছাড়াও হাজিরা যেসব অবকাঠামোগত সমস্যার মধ্যে পড়েন তা সমাধানের ব্যাপারে কিছু সুপারিশ তিনি করেছেন।

যার মধ্যে একটি প্রধান সমস্যা হয় যানবাহন নিয়ে। জেদ্দা থেকে মক্কা, সেখান থেকে মিনা ও আরাফাহ এবং আরাফাহ থেকে মুজদালিফাহ পরে মক্কা থেকে মদিনায় আসা যাওয়ার যানবাহনের ব্যবস্থা সৌদি মুত্তাওয়িফরা করে থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশী হজযাত্রীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় তুলনামূলক নিম্নমানের যানবাহন দেয়া হয়ে থাকে। আরাফাহ থেকে মুজদালিফাহ আসার সময় প্রায়ই যানবাহন সঠিক সময়ে আসে না। সৌদি পুলিশের সহায়তায় তাদের মুজদালিফাহ আসতে হয়। এসব বিষয় বাংলাদেশের হজ মিশন বা ধর্ম মন্ত্রণালয় দেখতে পারে। কিন্তু সেটি কদাচিৎ লক্ষ করা যায়।

বাংলাদেশী হাজিদের ওয়াশ রুম নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়তে হয়। মিনা বা আরাফাহ উভয় স্থানে প্রস্রাব পায়খানা আর গোসলখানা এক অপরিসর কক্ষে ব্যবস্থা করা। যার কারণে বাথরুমে দীর্ঘ লাইন পড়ে যায়। আবার অপরিসর টয়লেটে গোসল করতে অনেকের রুচিতে বাধে। এতে পাক পবিত্রতা নিয়ে অনেকের মধ্যে সংশয় জাগে। এ সমস্যার সহজ সমাধান করা যায় তিন কাজের জন্য পৃথক ব্যবস্থা করে। এটি ছাড়াও ইতিহাসের বিষয়াবলি ও পুণ্যস্মৃতি নিয়ে মিউজিয়াম করাসহ আরো কিছু সুপারিশ বইটিতে করা হয়েছে, যা সৌদি সরকার বিবেচনা করতে পারে। আমেরিকান কালো মুসলিমদের নেতা ম্যালকম এক্স, যিনি ইসলাম গ্রহণের পর মালিক আল সাবাজ হিসেবে পরিচিত হন, এর ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত আত্মজীবনীতে হজের ওপর উল্লেখ করা একটি মন্তব্য দিয়ে বইটি শেষ করেছেন শাহ হালিম। ম্যালকম এক্সকে প্রশ্ন করা হয়েছিল হজের কোন জিনিসটি তাকে সবচেয়ে বেশি আপ্লুত করেছে। তিনি জবাব দিয়েছিলেন ‘ভ্রাতৃত্ববোধ’। মুসলিম উম্মাহর আজকের সবচেয়ে বড় সঙ্কট সম্ভবত ভ্রাতৃত্ববোধের অভাব। এ জন্য শিয়া সুন্নি, দেশে দেশে, জাতিতে জাতিতে রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাত থামানো যাচ্ছে না। শাহ আবদুল হালিম তার বইটিতে এই দিকটির ওপর বারবার গুরুত্ব দিয়েছেন। বইটিকে বাংলায় অনুবাদ করে ব্যাপকভাবে প্রচারের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।

Category: হজ্জ