ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

হজ বুদ্ধির ওপর হৃদয়ের প্রাধান্য

মানুষের জীবনে এমন নাজুক মুহূর্ত কখনও কখনও আসে যখন তাকে আপসহীন বিদ্রোহ ঘোষণা করতে হয় বুদ্ধির অনুশাসন ও মোড়লিপনার বিরুদ্ধে। নিজের হাতে গড়া আইন-কানুন, অভ্যস্ত জীবনের বাহ্যাড়ম্বর ও কৃত্রিমতাপূর্ণ পরিবেশ এবং গতানুগতিক সামাজিক বন্ধন ছিন্ন করে তাকে বেরিয়ে আসতে হয় আকল ও বুদ্ধির অব্যাহত গোলামির গণ্ডি থেকে। নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বুদ্ধির কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও সঁপে দিতে হয় হৃদয়ের হাতে।

আকলের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেই পথে পথে, মরু-প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে তাকে মঞ্জুর করতে হয় অতৃপ্ত হৃদয়ের প্রার্থনা। যেমনটি করে থাকে অদূর মিলনের সুখস্বপ্নে বিভোর আশেক দল। গোটা জীবন কাটিয়ে সমাজ, সোসাইটি ও ফর্মালিটির গোলামিতে তাকে স্বাধীনচেতা ও বিপ্লবী বলা যেতে পারে কীভাবে? প্রভুক্ত ও প্রেমিক বলে কী করে পরিচয় দিতে পারে সে, যার প্রতিটি কদম চলে বুদ্ধির ওপর নির্ভর করে? আকলের নিক্তিতে লাভ-লোকসান যাচাই করে? অনুগত বান্দা কী করে হতে পারে সে, লাভের অংক না কষে প্রভুর কোনো নির্দেশ মাথা পেতে মেনে নিতে রাজি নয় যে।

বস্তুত আগাগোড়া হজের সব কর্মকাণ্ডই বুদ্ধির গোলাম এবং ডিসিপ্লিন প্রেমিকদের স্বরচিত আইন-কানুন ও গতানুগতিকতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। কেননা হজের উদ্দেশ্যই হলো মানুষের মধ্যে এমন এক পবিত্র মনোভাব গড়ে তোলা যা তাকে অদৃশ্যে বিশ্বাসী করে তুলবে এবং আল্লাহ্র নির্দেশকে আল্লাহ্র নির্দেশের পরিচয়েই নির্দ্বিধায় মেনে নিতে উদ্বুদ্ধ করবে। আকল-বুদ্ধির কোনো রকম মোড়লিপনাই তখন সে বরদাশ্ত করতে রাজি হবে না। কেননা নির্দেশদাতা যিনি, আকলের স্রষ্টাও তিনি।

মহাত্মা ইমাম গাজ্জালী (রহ.) তার স্বভাবসুলভ প্রাণবন্ত ও বলিষ্ঠ ভাষায় হজের এ হাকিকত ও তাত্পর্য তুলে ধরেছেন, যা মুক্তবুদ্ধির অতি বড় পূজারীর কঠিন হৃদয় মুগ্ধ না হয়ে পারে না। অত্যন্ত সার্থকভাবে তিনি আমাদের সামনে পেশ করেছেন হজের প্রাণ ও সার-নির্যাস যা দুঃখজনকভাবে সমসাময়িক ও প্রাচীন অনেক মুসলিম চিন্তাবিদের দৃষ্টিই এড়িয়ে গেছে।

তিনি লিখেছেন :
‘রূপ ও প্রকৃতির দিক থেকে বায়তুল্লাহ্ হচ্ছে জ্যোতির্ময় কোনো শাহি দরবারের মতো। কল্যাণ প্রার্থীরা দূর-দূরান্ত থেকে বিপদসঙ্কুল ও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে দুর্বল ও শক্তিহীন দেহে কোনোরকমে সেখানে উপস্থিত হতে পেরেই নিজেকে সে ধন্য ও কৃতার্থ মনে করে। ঘরের মালিকের (আল্লাহর) দরবারে স্বতঃস্ফূর্ত আত্মসমর্পণ করে। তাঁর অনন্ত মহিমা, বদান্যতা ও কল্যাণময় গুণাবলীর সকৃতজ্ঞ অনুভূতি তার হৃদয় উদ্ভাসিত করে দেয়। সেই সঙ্গে নিজের দীনতা, ক্ষুদ্রতা ও অযোগ্যতার সুতীব্র অনুভূতি তাকে করে তোলে আরও সঙ্কুচিত, আরও কুণ্ঠিত। তার আবদিয়াত লাভ করে এক চরম ও পরম পূর্ণতা। এজন্যই তখন তাকে এমন সব ক্রিয়াকর্মের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যার যৌক্তিকতা আকল-বুদ্ধির নিক্তিতে যাচাই করা সম্ভব নয় কিছুতেই। যেমন মিনায় কঙ্কর নিক্ষেপ, সাফা-মারওয়ার মাঝে দৌড়ঝাঁপ। এগুলো মূলত পরিপূর্ণ আবদিয়াত ও চরম আত্মবিলোপের পরিচায়ক।

যাকাতের যৌক্তিকতা খুব সহজেই বুদ্ধির মাপকাঠিতে গ্রহণ করে নেয়া যায়। কেননা তাতে রয়েছে এক ধরনের সহানুভূতি ও সহমর্মিতার প্রকাশ। তদ্রূপ রোজা হলো আত্মদমন ও নফসের পাশববৃত্তি নিয়ন্ত্রণের এক মোক্ষম পন্থা এবং অন্যান্য ব্যস্ততা হ্রাস করে অধিক পরিমাণ ইবাদতের অনুকূল পরিবেশ। নামাজের সপক্ষেও বুদ্ধিগ্রাহ্য যুক্তি পেশ করা যেতে পারে। কেননা রুকু-সিজদার মাধ্যমে রহমান রাহিম আল্লাহ্র দরবারে বিনয়, নম্রতা ও ক্ষুদ্রতা প্রকাশ করা হয়। কিন্তু হজের ক্রিয়া-কাণ্ডের সপক্ষে এমন কোনো যুক্তি পেশ করা সম্ভব নয়, যা মানব বুদ্ধি অসঙ্কোচে মেনে নেবে। বরং আকল-বুদ্ধির শাসন উপেক্ষা করে আনুগত্য ও সমর্পণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়েই শুধু মানুষ এ নির্দেশগুলো পালন করে থাকে। একটা অনুভূতিই শুধু তাকে তখন নিয়ন্ত্রণ করে; অর্থাত্ এটা আমার আল্লাহ্র নির্দেশ যা সর্বাবস্থায় অবশ্যপালনীয়।

হজের উদ্দেশ্যই হলো আকলকে তার সব কর্তৃত্ব ও মোড়লিপনা থেকে অপসারিত করা এবং নফসকে তার অভ্যস্ত পথ থেকে সরিয়ে এনে এক নতুন পথের পথিক বানিয়ে দেয়া। কেননা আকল ও বুদ্ধির সমর্থনপুষ্ট যে কোনো কাজের প্রতিই মানুষের স্বভাব ও ফিতরত আগ্রহী হয়ে থাকে। সে আগ্রহই তখন সে আমলের জন্য চালিকাশক্তিরূপে কাজ করে। ফলে আবদিয়াতের চরম বিকাশ ও পরম প্রকাশ সেখানে ঘটে না।

তাই রাসুল করিম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম হজ সম্পর্কে বিশেষভাবে বলেছেন :
‘হে প্রতিপালক! হজের জন্য আমি হাজির! ইখলাস ও আবদিয়াতের পরিপূর্ণ মনোভাব নিয়ে আমি হাজির।’ হজ ছাড়া অন্য কোনো ইবাদত, এমনকি নামাজের জন্যও পেয়ারা রাসুল এ শব্দ ব্যবহার করেননি। আপন হিকমত অনুযায়ী আল্লাহ্পাক জিন-ইনসানসহ কুল-মাখলুকাতের নাজাত ও মুক্তির জন্য এটাই শর্ত করেছেন যে, নিরঙ্কুশ আনুগত্য ও পরিপূর্ণ আবদিয়াতই হতে হবে সব কর্মকাণ্ডের চালিকাশক্তি।

আর পরিপূর্ণ আনুগত্য ও আবদিয়াতের মনোভাব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সেই ইবাদতই অধিকতর কার্যকর যার যৌক্তিকতা মানুষের আকল-বুদ্ধির ঊর্ধ্বে। কেননা আকলের সামান্যতম অংশীদারিত্বও এখানে নেই। এখানে হৃদয়েরই একচ্ছত্র আধিপত্য।

এই নিগূঢ় তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করার পর হজের কোনো ক্রিয়াকর্মকেই আর অস্বাভাবিক, অযৌক্তিক কিংবা বিস্ময়কর মনে হবে না।

Category: হজ্জ