ইসলাম ও আমাদের জীবন

বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

ইসলাম ও আমাদের জীবন - বিভিন্ন সংবাদপত্র থেকে নেয়া কিছু লেখা …

মধুর প্রতিদান কোরআন তেলাওয়াতে

কোরআন তেলাওয়াত একটি পুণ্যময় ইবাদত। ধর্মপরায়ণ লোকেরা কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অতি উত্তম পন্থায় আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই এ কোরআন আল্লাহর ভোজসভা, তোমরা সথাসাধ্য আল্লাহর ভোজসভায় উপস্থিহ হও। কোরআন আল্লাহর রজ্জু, সুস্পষ্ট আলো এবং উপকারী চিকিত্সা। যে কোরআনকে আঁঁকড়ে ধরবে, সে পাপ-পঙ্কিলতা ও অপবিত্রতা থেকে রক্ষা পাবে। যে কোরআন অনুসরণ করবে সে নাজাত পাবে, সে পথভ্রষ্ট হবে না বরং আল্লাহর নিয়ামত ও সন্তুষ্টি পাবে। সে বাঁকা পথে যাবে না বরং সহজ সরল পথে পরিচালিত হবে। (মিশকাত)

রমজানে কোরআন তেলাওয়াতের প্রতিদান ও পূণ্য অনেক বেশি। কেননা রমজান হলো কোরআন নাজিলের মাস। আর কোরআন নাজিলের মাসে কোরআনের চর্চা ও পাঠাভ্যাস নিঃসন্দেহে পূণ্যময়। রাসূলের (সা.) জীবদ্দশায় তাকে প্রতি রমজানে হযরত জিব্রাইল (আ.) এসে তার প্রতি অবতীর্ণ হওয়া কোরআনের সবটুকু তেলাওয়াত করে শুনাতেন। মাহে রমজানের রাতের বেলায় তারাবি-তাহাজ্জুদসহ দিন-রাতের বিভিন্ন সময় কোরআন তেলাওয়াতের প্রেরণা হাদিসে বিদ্যমান। হজরত আয়েশা (রা.) কে নবী করিম (সা.) এর চরিত্র-বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘তার চরিত্র ছিল হুবহু কোরআনের মত।’ অর্থাত্ তিনি ছিলেন কোরআনের জীবন্ত রূপ।

মহানবী (সা.) হজরত আবু জর গিফারি (রা.) কে উপদেশ দিয়েছেন, ‘তোমার কোরআন তেলাওয়াত করা উচিত। কেননা তা দুনিয়ায় তোমার জন্য আলো এবং আসমানে তোমার জন্য সঞ্চিত ধনভাণ্ডার।’ হযরত মাকাল ইবনে ইয়াছার (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর কোরআন কলব বা হৃদপিণ্ড। যদি কোনো ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালীন সওয়াবের উদ্দেশে তা পাঠ করে, তাহলে আল্লাহতায়ালা তার গোনাহসমূহ মাফ করে দেন। তোমরা এই সুরা মৃতদের উদ্দেশে পাঠ কর। (আবু দাউদ. নাসায়ি, আহমদ)

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলে করিম (সা.) বলেছেন, ‘কোরআনে সুদক্ষ ব্যক্তি পূণ্যবান সম্মানিত ফেরেশতাদের সান্নিধ্যে থাকবে এবং যে ব্যক্তি কোরআন তেলাওয়াত করে, তেলাওয়াতে কষ্ট ও ক্লান্তি অনুভব করে এবং তা তার জন্য কষ্টকর হওয়া সত্ত্বেও বার বার তেলাওয়াত করে, তার জন্য দু’টি প্রতিদান রয়েছে। একটি তেলাওয়াতের জন্য, অন্যটি কষ্টের জন্য।’ (বুখারি-মুসলিম)

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) কোথাও একটি প্রতিনিধিদল পাঠাচ্ছিলেন। তিনি তাদের থেকে কোরআন শুনতে চাইলেন। প্রত্যেকে কোরআনের যেটুকু জানতেন, তা পাঠ করে শুনাতে লাগলেন। ইত্যবসরে একজন অল্পবয়স্ক যুবক উপস্থিত হলে, তাকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে যুবক! তোমার সঙ্গে কী আছে ? যুবকটি বললো, আমার সঙ্গে ইত্যাদি ইত্যাদি এবং সুরা বাকারা আছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমার সঙ্গে সুরা বাকারাও আছে ? যুবকটি বললো, জী। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, যাও, তুমিই এদের নেতা।

আমাদের পূর্বসূরী আল্লাহর নেক বান্দাগণ পবিত্র কোরআন ও তার তেলাওয়াতের অশেষ ফজিলত সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তারা কোরআনকে আইন-কানুন ও বিধি-বিধানের উত্স, সংবিধান, হৃদয়ের বসন্ত এবং ইবাদতের অজিফা বানিয়েছিলেন। তারা কোরআনের জন্য অন্তর খুলে দিয়েছিলেন। হৃদয় দিয়ে কোরআনকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। কোরআনের উচ্চমানের শিক্ষা ও তাত্পর্য তাদের রূহ বা আত্মাকে পরিতৃপ্ত করেছে। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে দুনিয়ার জীবনে নেতৃত্ব দান করেন। আর তাদের জন্য পরকালে উচ্চতর মর্যাদা রয়েছে।

পক্ষান্তরে কোরআনের কোনো সুরা বা আয়াত শেখার পর ভুলে যাওয়ার চেয়ে বড় গুনাহ আর নেই। অতএব, প্রত্যেক মুসলিমের-বিশেষত, আলেম বুদ্ধিজীবী, নেতৃবর্গ ও কর্মীদের উচিত, আল্লাহ তায়ালার কিতাবকে সর্বাগ্রে অজিফা বানানো এবং প্রতিদিন কোরআনের কিছু অংশ পাঠ করা। প্রত্যেকে নিজের সময় সুযোগমতো তেলাওয়াত করবেন, যাতে একটি দিনও তেলাওয়াতবিহীন অবস্থায় অতিবাহিত না হয়। কেউ পাঠ করতে না পারলে শোনার চেষ্টা করবেন। অন্তত ছোট ছোট সুরা মুখস্ত করে তা সময় সুযোগমতো তেলাওয়াত করা উচিত।

কোরআনের প্রতি আমাদের প্রথম ও প্রধান দায়িত্বই হলো বিশুদ্ধভাবে তেলাওয়াতের চেষ্টা করা। তারপর বেশি বেশি তেলাওয়াত করা। রমজানে এক খতম কোরআন— অন্য যেকোন মাসের চেয়ে সত্তর গুণ বেশি সওয়াব। তাই তারাবি, তাহাজ্জুদ ছাড়াও দিনের বেলায় কোরআন তেলাওয়াত করা উচিত। রাসূলে করিম (সা.) নিজে এবং সাহাবায়ে কেরামও এ মাসে বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করতেন। পরবর্তী যুগের ইমাম, মুহাদ্দিস ও সাধক-বুজুর্গদের জীবনেও রমজানে কোরআন তেলাওয়াত ড়ও চর্চার বিস্ময়কর নানা ঘটনা রয়েছে।

কোরআনের মাসে কোরআনের তেলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা খুব সহজ। কোরআন তেলাওয়াত মানব হৃদয়ে তাকওয়ার গুণ জাগিয়ে তুলতে বাধ্য। এ তাকওয়ার গুণের বদৌলতেই জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম লাভ করার দাবি করা যায়। আল্লাহ বাব্বুল আলামিন আমাদেরকে রমজানে অধিকহারে কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করবেন —এটাই আমাদের কাম্য।

Category: কুরআন